নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ভোলায় মৎস্য চাষে নিজের ভাগ্য বদল করেছেন দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের বাসিন্দা খামারি আলহাজ্ব আমির হোসেন খান। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নিজেকে একজন সফল চাষী হিসেবে গড়ে তুলতে করেছেন তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম। অবশেষে শুধু সফল চাষিই নন, হয়েছেন তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা। গড়ে তুলেছেন ৭০ টিরও বেশি পুকুর ও তিনটি হ্যাচারি। যা থেকে প্রতিবছর তিনি আয় করছেন লাখ লাখ টাকা। সৃষ্টি হয়েছে স্বস্ত্রাধিক মানুষের কর্মসংস্থান।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভোলা সদর উপজেলার ভেলুমিয়া, উত্তর দিঘলদী ও দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলা আমির হোসেন খান এর ‘রূপালী মৎস্য খামার ও হ্যাচারী’ ইতোমধ্যেই স্থানীয়ভাবে একটি সফল ও অনুসরণযোগ্য উদ্যোগ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। প্রতিদিন এই সমাজে শত শত শ্রম কাজ করার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে তাদের কর্মসংস্থান।
এই খামার থেকে উৎপাদিত রুই, কাতল, পাঙ্গাস, তেলাপিয়া সহ বিভিন্ন ধরনের মাছ স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অর্থনীতির উন্নয়নেও রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
স্থানীয়রা বলছেন, যে মানুষটি কোন একদিন কর্মসংস্থানের সন্ধানে বিভিন্ন দিকে ছুটে বেরিয়েছেন। আজ সেই মানুষটি নিজে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের তৈরি করছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও দক্ষিণ দিঘদী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবু সুফিয়ান নোমান বলেন, কথায় আছে পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি। আজ সেই পরিশ্রমের মধ্য দিয়েই আমীর হোসেন তার ভাগ্য পরিবর্তন করে দেখিয়ে দিয়েছেন। তার খামারের উৎপাদিত মাছ স্থানীয় বাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। বহুদূরান্ত থেকে ব্যবসায়ী ও পাইকাররা এসে তার খামার থেকে লাখ লাখ টাকার মাছ ক্রয় করে নিয়ে যায়।
একইভাবে স্থানীয় বাসিন্দা জাফর ইকবাল, মোসলেউদ্দিন, শাহাবুদ্দিন হাওলাদার সহ আরো অনেকে বলেন, তার খামারের অধিকাংশ পুকুরী নদীর সাথে সংযুক্ত। তাতে করে জোয়ারের পানি আসা-যাওয়া করায় ওই সকল পুকুরের মাছ খুবই অন্যসব চাষের মাছের চেয়ে একটু ব্যতিক্রম এমনকি খুবই সুস্বাদু। তাতে করে বাড়তি দাম দিয়েও তার খামারের উৎপাদিত মাছ নেয়ার জন্য অনেক পাইকাররা আগাম দাদন দিয়ে যায়।
এছাড়া আমির হোসেনের রয়েছে তিনটি হ্যাচারী। যা থেকে মাছের ডিম ও রেনুপোনা উৎপাদন করা হয়। এ সকল ডিম ও রেনুপোনাও ভোলার বিভিন্ন উপজেলা সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করা হয়।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১২০ একর জমিতে আমির হোসেনের রূপালী মৎস্য খামার ও হ্যাচারীতে ১ কেজি ডিম ফুটাতে খরচ হয় ২৫০০ টাকা। ওই ডিম কেজি প্রতি বিক্রি হয় ৩ হাজার থেকে শুরু করে ৫ হাজার কখনো ৭ টাকায়। এছাড়া হ্যাচারীতে উৎপাদিত রেনুপোনা ৪০ পয়সা থেকে শুরু করে এক টাকা ২০ পয়সা পর্যন্ত বিক্রি হয়। একদিনের রেনুপোনা বিক্রি হয় ৪০ পয়সা। আর ১ মাসের রেনুপোনা বিক্রি হয় ১ টাকা ২০ পয়সা। তাতে করে এক একটি রেণুপোনায় লভ্যাংশের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ থেকে ২০ পয়সা।
অন্যদিকে, পুকুরে চাষের পাঙ্গাস ১৪ মাসেই বিক্রি করার উপযোগী হয়ে ওঠে। তাতে করে এক একটি মাছ আড়াই থেকে তিন কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। যা মনপ্রতি বিক্রি করেন ৫-৬ হাজার টাকা। একইভাবে ১ কেজির তেলাপিয়া মাছ মনপ্রতি ব্যক্তি হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। এর নিচের গুলো ৬-৭ হাজার টাকা। যদিও মাঝেমধ্যে বাজার মূল্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দামও উঠানামা করে।
তাতে করে প্রতিবছরে তার খামার থেকে খরচ বাদ দিয়ে মোটা অংকের ঢাকা তার মুনাফা অর্জিত হয়। যা দেশের অর্থনীতিতে অনেকটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এদিকে আমির হোসেনের সফলতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এলাকার বহু বেকার যুবকরা তাকে অনুকরণ করে এমনকি তার পরামর্শে একে একে গড়ে তুলেছেন বহু মৎস্য খামার। তাদের মধ্যে অধিকাংশরাই সফলতা পেয়ে নিজেদেরকেও প্রতিষ্ঠিত খামারি হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
যদিও এর প্রতিদান হিসেবে বিভিন্ন সময় জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উপলক্ষে তিনি একাধিকবার মৎস্য অধিদপ্তর থেকে সম্মাননা স্মারক লাভ করেছেন।
যদিও সরকারের একটু পৃষ্ঠপোষকতা পেলে খামারের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি করার পাশাপাশি এখানে বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন বলে জানান রুপালি মৎস্য খামার ও হ্যাচারির মালিক মোঃ আমির হোসেন খান। তিনি বলেন, উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে বহু সরকারি প্রকৃত খাস জমে রয়েছে। সরকার যদি সহজ শর্তে ওই সকল জমি বন্দোবস্ত দেয় তাহলে ওই সকল বন্দোবস্ত জমিতে তিনি আমাদের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে ভোলা তথা দেশের মধ্যে আরো বৃহৎ খামারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।