শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে নতুন সংঘাত, মুখোমুখি ভারত-পাকিস্তান Discovering the Best Online Casino No KYC for Quick and Secure Play Not Gamstop Casinos How They Work and What to Know নাটোরের লালপুরে অবৈধ সার মজুদ, ৪ ব্যবসায়ীকে ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা​ Guide to new online casinos not registered with gamstop safely অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ: তদন্তেই হোক সত্য-মিথ্যার ফয়সালা ফ্যাসিস্টরা মিডিয়ার উপর নগ্ন হস্তক্ষেপ করেও রক্ষা পায়নি…তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী পার্থ  ভোলায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আন্দালিব রহমান পার্থ’র সাথে শুভেচ্ছা ও মতবিনিময় করলেন জেলার তথ্য কর্মকর্তা শাহ আব্দুর রহিম নুরন্নবী সহ অফিসের অন্যান্যরা দৌলতপুরে নদীভাঙনকবলিত মানুষের পাশে এবিজি ফাউন্ডেশন

সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে নতুন সংঘাত, মুখোমুখি ভারত-পাকিস্তান

  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

বিশেষ প্রতিনিধিঃ একটি চুক্তি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে? আর দুই দেশের সম্পর্কের মৌলিক পরিবর্তন ঘটলে সেই চুক্তির সুবিধা কি আগের মতো বহাল রাখা সম্ভব? ভারত-পাকিস্তানের ৬৬ বছরের পুরোনো সিন্ধু পানি চুক্তি ঘিরে এখন এই প্রশ্নগুলোই সামনে এসেছে।

২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হন। ভারত এ হামলার জন্য পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসীদের দায়ী করে। এর পরই নয়াদিল্লি ঘোষণা দেয়, পাকিস্তান বিশ্বাসযোগ্য ও অপরিবর্তনীয়ভাবে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে সমর্থন বন্ধ না করা পর্যন্ত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত থাকবে।

ভারতের এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য শুধু পানি বণ্টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে নয়াদিল্লি স্পষ্ট করেছে, পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্কের অবনতিকে তারা অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা থেকে পুরোপুরি আলাদা করে দেখতে চাইছে না।

সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে বিরোধ এবার আন্তর্জাতিক আইনি পরিসরেও গড়িয়েছে। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পাকিস্তানের আবেদনের পর চুক্তির আওতায় গঠিত আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত রায় দেয়, সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো কার্যকর। ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তে চুক্তি স্থগিত বা বাতিল করা যায় না বলেও আদালত মত দেয়। একই সঙ্গে ভারতের রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে কিছু অন্তর্বর্তী বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

পাকিস্তান এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। তবে ভারত তা প্রত্যাখ্যান করেছে। নয়াদিল্লির বক্তব্য, তারা ওই সালিসি প্রক্রিয়াকে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিয়ে রায় দেওয়ার এখতিয়ারও ওই ট্রাইব্যুনালের নেই বলে মনে করে দেশটি।

এ কারণে সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে বিরোধ এখন কেবল পানি বণ্টন বা প্রকল্প নির্মাণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক আইন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার সংকট।

১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির আওতায় সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব নদীর পানি ব্যবহারে পাকিস্তানের প্রধান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে রাভি, বিয়াস ও শতদ্রু নদীর পানি ব্যবহারে ভারত অধিকতর অধিকার পায়। একই সঙ্গে উভয় দেশকে নির্দিষ্ট শর্তে একে অপরের নদীর পানি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়।

দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ, সামরিক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক বিরোধ চললেও এই চুক্তি দীর্ঘ সময় কার্যকর ছিল। সে কারণে আন্তর্জাতিক পরিসরে এটিকে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সফল পানি সহযোগিতার অন্যতম উদাহরণ হিসেবেও দেখা হয়।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি আগের মতো নেই। দুই দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে, পানির চাহিদা বেড়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও তীব্র হয়েছে। একই সঙ্গে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

ভারতের অবস্থানকে সরলভাবে দেখলে মনে হতে পারে, একটি সন্ত্রাসী হামলার প্রতিক্রিয়ায় একটি পানি চুক্তি স্থগিত করা হয়েছে। কিন্তু নয়াদিল্লির যুক্তি এর চেয়ে বিস্তৃত।

ভারত দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানভিত্তিক বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছে। মুম্বাই, উরি, পুলওয়ামা ও সর্বশেষ পাহেলগাম হামলার মতো ঘটনাগুলো দুই দেশের সম্পর্ককে বারবার সংকটের মধ্যে ফেলেছে। পাকিস্তান অবশ্য ভারতের এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

ভারতের দৃষ্টিতে, পাহেলগাম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকটের ধারাবাহিকতার অংশ। ফলে এমন পরিস্থিতিতে পানি, বাণিজ্য বা অন্যান্য সহযোগিতাকে নিরাপত্তা সম্পর্ক থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখার পুরোনো নীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করে নয়াদিল্লি।

এখানে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সন্ত্রাসী হামলা ঘটলেই কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়—এমন কোনো সরল আইনি নিয়ম নেই। ভারতও চুক্তিকে চিরতরে বাতিল করার কথা না বলে স্থগিত রাখার কথা বলছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে ভবিষ্যতে সহযোগিতার পথ আবার খোলার সুযোগ তারা রাখছে।

আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো—চুক্তি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রকে তা পালন করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতার জন্য এই নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে আন্তর্জাতিক আইন সব পরিস্থিতিকে এক রকমভাবে দেখে না। বিশেষ পরিস্থিতিতে চুক্তি স্থগিত, পরিবর্তন বা বাতিলের কিছু আইনি ভিত্তিও রয়েছে। গুরুতর চুক্তিভঙ্গ কিংবা পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তনের মতো বিষয় আন্তর্জাতিক চুক্তি আইনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব রাজনীতিতেও দেখা গেছে, জাতীয় নিরাপত্তা বা পরিবর্তিত কৌশলগত বাস্তবতার কারণে রাষ্ট্রগুলো পুরোনো চুক্তি থেকে সরে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে করা অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। পরে ২০১৯ সালে রাশিয়ার সঙ্গে করা আইএনএফ চুক্তি থেকেও সরে আসে ওয়াশিংটন।

এসব সিদ্ধান্তের আইনি ও রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে এগুলো দেখায়, রাষ্ট্রগুলো সব সময় চুক্তিকে পরিবর্তিত বাস্তবতার ঊর্ধ্বে রাখে না। নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন ঘটলে পুরোনো প্রতিশ্রুতি নতুন করে মূল্যায়নের প্রবণতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রয়েছে।

সিন্ধু নদ অববাহিকা পাকিস্তানের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির কৃষি, সেচব্যবস্থা এবং অর্থনীতির বড় অংশ এই নদীব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।

এ কারণে সিন্ধু পানি চুক্তি শুধু দুই দেশের মধ্যে একটি সাধারণ পানি বণ্টন চুক্তি নয়। পাকিস্তানের কাছে এটি দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

ভারত চুক্তি স্থগিত রাখার ঘোষণা দেওয়ার পর পাকিস্তানের উদ্বেগ তাই স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। অন্যদিকে ভারত বলছে, চুক্তির সুবিধা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আর আলাদা করে দেখার মতো অবস্থায় দুই দেশের সম্পর্ক নেই।

দ্য হেগের সালিসি আদালতের রায় আইনি বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। আদালত চুক্তিকে কার্যকর হিসেবে বিবেচনা করেছে এবং ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তের আইনি প্রভাব নিয়ে অবস্থান জানিয়েছে।

কিন্তু এই রায় দুই দেশের রাজনৈতিক অবিশ্বাস দূর করতে পারবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

কারণ ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বর্তমান সংকট শুধু একটি চুক্তির ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সন্ত্রাসবাদ, সীমান্ত নিরাপত্তা, কাশ্মীর এবং পারস্পরিক আস্থার গভীর সংকট।

ভারতের অবস্থান হলো, পানি সহযোগিতা আবার স্বাভাবিক করতে হলে নিরাপত্তা পরিস্থিতিরও উন্নতি প্রয়োজন। অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য সিন্ধু পানি চুক্তির ধারাবাহিকতা পানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

সিন্ধু পানি চুক্তির ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত শুধু আদালতের রায়ে নির্ধারিত হবে না। এর সঙ্গে দুই দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ভারত যদি মনে করে পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে, তাহলে চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একইভাবে পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ দূর করার মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

৬৬ বছর ধরে টিকে থাকা সিন্ধু পানি চুক্তি তাই এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে। চুক্তিটি একসময় যুদ্ধ ও বৈরিতার মধ্যেও দুই দেশকে পানি সহযোগিতার একটি কাঠামোর মধ্যে রেখেছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই সহযোগিতা টিকিয়ে রাখতে শুধু আইনি কাঠামো যথেষ্ট কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

পানি বণ্টনের নিয়ম হয়তো চুক্তিতে নির্ধারিত। কিন্তু সেই চুক্তি কার্যকর রাখার জন্য যে রাজনৈতিক আস্থা প্রয়োজন, সেটি দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সিন্ধু পানি চুক্তির ভবিষ্যৎ তাই শেষ পর্যন্ত শুধু পানির প্রশ্ন নয়। এটি ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা নীতি এবং পারস্পরিক আস্থারও একটি পরীক্ষা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews