
ডেস্ক রিপোর্টঃ দীর্ঘদিন পর হলেও ভোলাবাসীর জন্য বয়ে এনেছে সুখবর। ভোলা সদর ও দৌলতখানের শিবপুর, ধনিয়া ও মেদুয়ার মানুষের কাছে নদীভাঙনরোধে এবার এসেছে বড় প্রকল্পের খবর। এই তিনটি এলাকা রক্ষায় একনেক একটি নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘মেঘনা নদীর ভাঙন হতে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলাধীন শিবপুর, ধনিয়া ও মেদুয়া এলাকা রক্ষা’ প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সভায় মোট ১৫ হাজার ৮২৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের কথা জানিয়েছে প্রকাশিত প্রতিবেদন।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প তালিকা অনুযায়ী, ভোলার এই প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের মার্চ থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত এবং প্রকল্পের মোট ব্যয় ৬৮৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
তবে একনেকের অনুমোদনসংক্রান্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনে একই প্রকল্পের ব্যয় ৬০৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদিত নথিতে ব্যয়ের অঙ্কটি যাচাই করে প্রকাশ করাই হবে অধিকতর নির্ভরযোগ্য।
প্রকল্পটি যে এলাকায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেখানে নদীভাঙনের ক্ষতচিহ্ন এখনো স্পষ্ট। চলতি বছরের আগস্টে শিবপুর ও মেদুয়া এলাকায় প্রায় চার কিলোমিটারজুড়ে তীব্র ভাঙনের খবর পাওয়া যায়। এতে ফসলি জমি, বসতঘর ও দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উঠে আসে। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, বিভিন্ন স্থানে জিওব্যাগ ফেলেও ভাঙনের গতি ঠেকানো যাচ্ছে না।
সেপ্টেম্বরেও শিবপুর ও মেদুয়া এলাকায় ভাঙন অব্যাহত থাকার খবর এসেছে। স্থানীয় সংবাদপ্রতিবেদন অনুযায়ী, নদীতীরে জিওব্যাগ স্থাপন করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছিল না। মেঘনার স্রোতে হাট-বাজার, ফসলি জমি ও বসতির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথাও উঠে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে স্থায়ী প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দাবিতে কয়েক মাস ধরে সোচ্চার ছিলেন নদীপাড়ের মানুষ। গত জুনে শিবপুর ও মেদুয়ার দুই শতাধিক বাসিন্দা ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয় ঘেরাও করে দ্রুত ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়।
নদীভাঙনের এই বাস্তবতা শুধু কয়েকটি পরিবারের বসতভিটা হারানোর গল্প নয়। একটি বাড়ি ভেঙে গেলে হারিয়ে যায় বহু বছরের সঞ্চয়; জমি নদীতে গেলে নষ্ট হয় জীবিকার ভিত্তি; একটি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হলে থমকে যায় স্থানীয় অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি। আর নদী যখন বসতির দিকে এগিয়ে আসে, তখন মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়ায়—পরের ঠিকানাটি কোথায়?
সেই দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার মধ্যেই প্রস্তাবিত প্রকল্পটি স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করছে। প্রকল্পের আওতায় শিবপুর, ধনিয়া ও মেদুয়ার ভাঙনপ্রবণ এলাকা সুরক্ষিত হলে বসতি, ফসলি জমি, স্থাপনা ও স্থানীয় অবকাঠামো রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পতালিকাতেও ভোলার বিভিন্ন নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা রক্ষায় একাধিক প্রকল্পের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে চরফ্যাশন পৌর শহর, তজুমদ্দিন উপজেলা সদর, সদর উপজেলার রাজাপুর ও পূর্ব ইলিশা এবং দৌলতখান-বোরহানউদ্দিনের পোল্ডার এলাকা রক্ষার প্রকল্পও রয়েছে।
তবে নদীভাঙন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে প্রকল্প অনুমোদনই শেষ কথা নয়। বরং অনুমোদনের পর অর্থছাড়, দরপত্র প্রক্রিয়া, নকশা অনুযায়ী কাজের মান এবং নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নদীর স্রোত কোনো প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করে না। একটি বর্ষা কিংবা কয়েক দিনের তীব্র স্রোতই বদলে দিতে পারে নদীতীরের মানুষের বহু বছরের পরিচিত ভূদৃশ্য।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও দাবির পর এই প্রকল্প অনুমোদন হওয়ায় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, এবার অস্থায়ীভাবে জিওব্যাগ ফেলার পরিবর্তে স্থায়ী প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কাজ এগোবে। তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হলে। প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছতা ও নির্ধারিত মান বজায় রেখে বাস্তবায়ন করা হবে কি না, সেটিও থাকবে জনসাধারণের নজরে।
ভোলার মেঘনা তীরের মানুষ তাই এখন আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চান না। তারা দেখতে চান নদীর পাড়ে বাস্তব কাজের চিহ্ন—শক্ত প্রতিরক্ষা, নিরাপদ বসতি আর এমন একটি ব্যবস্থা, যার ওপর ভর করে আগামী বর্ষায় ঘর হারানোর আতঙ্কে রাত জাগতে হবে না।
শিবপুর, ধনিয়া ও মেদুয়ার মানুষের কাছে এই প্রকল্পের গুরুত্ব সেখানেই। কয়েক শ কোটি টাকার হিসাবের বাইরে এটি তাদের কাছে ভিটেমাটি, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্ন। মেঘনা যেমন তাদের জীবনকে বহমান রেখেছে, তেমনি তার ভাঙন বহু পরিবারকে বারবার করেছে নিঃস্ব। এবার নদীর সেই অনবরত ভাঙনের সামনে একটি স্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে ওঠে কি না, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
একনেকে অনুমোদনের মধ্য দিয়ে সেই পথের শুরু হয়েছে। এখন নদীপাড়ের মানুষের অপেক্ষা—কবে প্রকল্পের কাজ দৃশ্যমান হবে, কবে মেঘনার পাড় শক্ত হবে, আর কবে ভাঙনের শব্দের সঙ্গে মিশে থাকা দীর্ঘদিনের আতঙ্ক কিছুটা হলেও থামবে।




